নিষ্প্রাণ শহর 


​যখন বাস থেকে ঢাকায় নামলাম, ততক্ষণে মোটামুটি সকাল হয়ে গেছে । পবনদা বলেছিলেন, ‘ঢাকায় নেমে সোজা আমার বাসায় চলে আসবেন।’ আমি মোবাইল বের করে পবনদাকে ফোন করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম অ্যাকাউন্ট একদম শূন্য। আমার মনে পড়ল, গতকাল রাতে ‘ইমারজেন্সি ব্যালান্স’ নিয়ে সেটাও শেষ করে ফেলেছি। এখন এই সকালবেলা ফ্লেক্সিলোডের দোকান কোথায় খোলা পাই! আমি আর ফয়সাল ফকিরাপুলের একটা খাবারের দোকানে ঢুকলাম। এখানে কিছুক্ষণ সময় কাটানো যাক।

নাশতা করার পর বসে থাকার আর কোনো মানে হয় না। ফয়সালের দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে আমি ওকে চলে যেতে বলে মোহাম্মদপুরের দিকে রওনা দিই। পবনদা বলেছিলেন, উনার বাসা মোহাম্মদপুর। ভাবলাম, মোহাম্মদপুর যেতে যেতে কোথাও কোনো দোকান খুলে যাবে।

মোহাম্মদপুরে পৌঁছে দেখি সেখানেও একই অবস্থা। আশপাশে দু-চারটি হোটেল খুললেও এত সকালে কোনো মোবাইল রিচার্জের দোকান খোলেনি। আমি ব্যাগপত্র নিয়ে হেঁটে হেঁটে আশপাশে চক্কর দিয়ে এলাম। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে একটি মসজিদের সিঁড়িতে ধপাস করে বসে পড়ি। একটু স্থির হয়ে তাকিয়ে দেখি আমার ঠিক পাশেই একজন ভিক্ষুক উদাস হয়ে বসে আছেন, আগে খেয়াল করিনি। ভিক্ষুকের ভিক্ষা করার দিকে কোনো মনোযোগ নেই, একমনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম, ‘মামা, কেমন আছেন?’ ভিক্ষুক বেশ বিরক্ত হলো। আমাকে একদম পাত্তা না দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডিস্টাব কইরেন না তো।’ আমি আর কথা বলার সাহস পেলাম না। ভিক্ষুকের মতো উদাস হয়ে বসে রইলাম।

সকালবেলায়ও রাস্তায় মানুষজন কম নেই। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম এর মধ্যে কেউ একবারও আমার দিকে ফিরে তাকায়নি। আমি মুহূর্তের মধ্যে ফিরে গেলাম আমার সেই ছোট্ট সবুজ গ্রামটাতে, যেখানে সবাই সবাইকে চেনে। যেখানে কোনো আগন্তুক দেখা গেলে মানুষজন কৌতূহলী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করে, কার বাড়িতে যাবেন। আর কোনো বাড়িতে অতিথি এলে তো মুহূর্তের মধ্যে পুরো পাড়ায় খবর রটে যায়। অথচ সেই একই মানুষ শহরে এলে কেমন যেন পাথরের মতো আচরণ করে। ইট-কাঠের জঞ্জাল সেই কৌতূহলী মানুষটাকে নিমেষেই নিষ্প্রাণ করে দেয়। আমার সেই প্রিয় গ্রামটার জন্য হঠাৎ করে আমার খুব মন খারাপ হয়। আমি বিষণ্ন হয়ে বসে থাকি। একটি মোবাইল রিচার্জের দোকান খুলতে দেখে আমি দৌড় দিলাম। আনন্দে আমার চোখে পানি এসে যায়। দোকানদার অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি কাঁদছেন কেন?’ আমি হাসতে হাসতে বলি, ‘আপনি দোকান খুলছেন দেখে আনন্দে কাঁদছি।’ দোকানদার বিড়বিড় করতে থাকেন, <‘মাথায় সমস্যা আছে মনে হয়!’>

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Blog at WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: